ডাক্তারের কলাম

পেশিতে টান, সারাক্ষণ ক্লান্তি, হাত-পা ঝিনঝিন—শরীরে কি ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি হচ্ছে?

আপনার বা আপনার পরিবারের কারও কি এসব লক্ষণ আছে? অবহেলা নয়, জেনে নিন ম্যাগনেসিয়ামের গুরুত্ব, ঘাটতির কারণ ও খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে তা পূরণের উপায়

ডাক্তারের কলাম | তৃণমূল ২৪|১৫ অক্টোবর ২০২৬||

আপনার কি মাঝেমধ্যে পায়ের পেশিতে টান ধরে? পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরও শরীর ক্লান্ত লাগে? হাত-পা ঝিনঝিন করে, পেশিতে কাঁপুনি হয়, কিংবা স্বাভাবিক কাজ করতেও শক্তি কম মনে হয়?

আপনার পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীদের মধ্যেও কি এমন সমস্যা রয়েছে?

প্রকৃতি পণ্য Ad Prokriti Ponno

অনেকেই এসব লক্ষণকে সাধারণ দুর্বলতা, বয়সের প্রভাব কিংবা কাজের চাপ বলে এড়িয়ে যান। অথচ কিছু ক্ষেত্রে শরীরে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে মনে রাখতে হবে, এসব লক্ষণ মানেই ম্যাগনেসিয়ামের অভাব নয়। ডায়াবেটিস, স্নায়ুর সমস্যা, পানিশূন্যতা, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কারণেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

তাহলে ম্যাগনেসিয়াম আসলে কী? কোন খাবারে এটি বেশি পাওয়া যায়? এর ঘাটতি হলে শরীরে কী ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে? চলুন, সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক।

ম্যাগনেসিয়াম কী এবং শরীরে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ম্যাগনেসিয়াম (Magnesium) হলো শরীরের জন্য অপরিহার্য একটি খনিজ উপাদান। শরীরের শত শত এনজাইম-নির্ভর প্রক্রিয়ায় এটি কাজ করে। পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রম, শক্তি উৎপাদন, হাড়ের স্বাস্থ্য এবং হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে ম্যাগনেসিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আমাদের শরীর নিজে পর্যাপ্ত পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম তৈরি করতে পারে না। তাই প্রতিদিনের খাবার থেকে এটি গ্রহণ করতে হয়।

ম্যাগনেসিয়ামের অভাবে কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?

শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি হলে প্রথম দিকে লক্ষণগুলো অস্পষ্ট থাকতে পারে। ঘাটতি বাড়লে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

১. পেশিতে টান ও ক্র্যাম্প: পায়ের পেশিতে টান ধরা, পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া কিংবা অনিয়ন্ত্রিত সংকোচন দেখা দিতে পারে।

২. সারাক্ষণ ক্লান্তি ও দুর্বলতা: পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরও ক্লান্ত লাগা বা দৈনন্দিন কাজের শক্তি কমে যাওয়া হতে পারে।

৩. হাত-পা ঝিনঝিন করা: আঙুল বা হাত-পায়ে ঝিনঝিন, অবশভাব কিংবা অস্বাভাবিক অনুভূতি দেখা দিতে পারে।

৪. পেশিতে কাঁপুনি: পেশি কেঁপে ওঠা বা অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া হতে পারে।

৫. ক্ষুধামন্দা ও বমি বমি ভাব: বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য ঘাটতিতে ক্ষুধা কমে যাওয়া, বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে।

৬. হৃদ্‌স্পন্দনের অস্বাভাবিকতা: গুরুতর ম্যাগনেসিয়াম ঘাটতি হৃদ্‌যন্ত্রের ছন্দে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

৭. খিঁচুনি ও স্নায়বিক জটিলতা: মারাত্মক ঘাটতিতে কাঁপুনি, খিঁচুনি কিংবা মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে পারে।

ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতির সঙ্গে রক্তে পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়ামের মাত্রা কমে যাওয়ারও সম্পর্ক রয়েছে।

সতর্কতা: পেশিতে টান বা ক্লান্তির মতো একটি-দুটি লক্ষণ দেখে নিজে নিজে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি নির্ণয় করবেন না। লক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ম্যাগনেসিয়ামের অভাবে কি বড় কোনো রোগ হতে পারে?

গুরুতর ম্যাগনেসিয়াম ঘাটতি শুধু দুর্বলতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

  • হৃদ্‌যন্ত্রের অনিয়মিত স্পন্দন।
  • রক্তে পটাশিয়াম কমে যাওয়া।
  • রক্তে ক্যালসিয়াম কমে যাওয়া।
  • গুরুতর ক্ষেত্রে খিঁচুনি ও স্নায়বিক সমস্যা।

অন্যদিকে, ম্যাগনেসিয়াম গ্রহণ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা রয়েছে। তবে এসব রোগের একমাত্র কারণ ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি নয়। সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলেই এসব রোগ প্রতিরোধ বা নিরাময় হবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই।

কোন কোন কারণে শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি হয়?

প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবারের অভাব একটি কারণ হতে পারে। এ ছাড়া—

  • দীর্ঘদিন ডায়রিয়া বা বমি হওয়া।
  • অন্ত্রের পুষ্টি শোষণের সমস্যা।
  • অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে প্রস্রাবের মাধ্যমে ম্যাগনেসিয়াম বেশি বেরিয়ে যাওয়া।
  • দীর্ঘদিন অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ।
  • কিছু মূত্রবর্ধক ওষুধের ব্যবহার।
  • দীর্ঘদিন কিছু অ্যাসিড কমানোর ওষুধ গ্রহণ।

এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।

কোন খাবারে কতটুকু ম্যাগনেসিয়াম থাকে?

ম্যাগনেসিয়ামের চাহিদা পূরণের সহজ উপায় হলো প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবার রাখা।

নিচে কিছু পরিচিত খাবারে ম্যাগনেসিয়ামের আনুমানিক পরিমাণ দেওয়া হলো:

খাবার পরিমাণ ম্যাগনেসিয়াম
কুমড়ার বীজ ২৮ গ্রাম প্রায় ১৫৬ মি.গ্রা.
কাঠবাদাম ২৮ গ্রাম প্রায় ৮০ মি.গ্রা.
কাজুবাদাম ২৮ গ্রাম প্রায় ৭৪ মি.গ্রা.
চিনাবাদাম ২৮ গ্রাম প্রায় ৪৯–৬৩ মি.গ্রা.
সেদ্ধ পালংশাক আধা কাপ প্রায় ৭৮ মি.গ্রা.
রান্না করা ডাল বা শিমজাতীয় খাবার আধা কাপ খাবারভেদে প্রায় ৩০–৬০ মি.গ্রা.
বাদামি চালের ভাত আধা কাপ প্রায় ৪২ মি.গ্রা.
কলা ১টি মাঝারি প্রায় ৩২ মি.গ্রা.
দুধ ১ কাপ প্রায় ২৭ মি.গ্রা.
মিষ্টি কুমড়ার শাঁস ১০০ গ্রাম প্রায় ১০–১২ মি.গ্রা.

উল্লেখিত পরিমাণগুলো আনুমানিক। খাবারের জাত, পরিবেশন-আকার ও রান্নার পদ্ধতি অনুসারে প্রকৃত পরিমাণ পরিবর্তিত হতে পারে।

বাংলাদেশে সহজলভ্য কোন খাবারগুলো রাখবেন খাদ্যতালিকায়?

কুমড়ার বীজ ও বাদাম: অল্প পরিমাণেই তুলনামূলক বেশি ম্যাগনেসিয়াম পাওয়া যায়। তবে ক্যালরির পরিমাণ বিবেচনায় রেখে পরিমিত খাওয়া ভালো।

ডাল ও ছোলা: মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা ও অন্যান্য শিমজাতীয় খাবার ম্যাগনেসিয়ামের পাশাপাশি প্রোটিন ও আঁশও সরবরাহ করে।

সবুজ শাকসবজি: পালংশাক, লালশাকসহ বিভিন্ন শাক নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।

পূর্ণশস্য: কম পালিশ করা চাল, লাল চাল, আটার রুটি ও ওটস ম্যাগনেসিয়ামের ভালো উৎস হতে পারে।

ফল: কলাসহ বিভিন্ন ফল খেলে ম্যাগনেসিয়ামের পাশাপাশি অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া যায়।

মনে রাখবেন, কোনো একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকা অনুসরণ করাই ভালো।

প্রতিদিন কতটুকু ম্যাগনেসিয়াম প্রয়োজন?

যুক্তরাষ্ট্রের NIH-এর পুষ্টি নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক ম্যাগনেসিয়ামের চাহিদা সাধারণত—

  • পুরুষ: ৪০০–৪২০ মি.গ্রা.
  • নারী: ৩১০–৩২০ মি.গ্রা.
  • গর্ভবতী নারী: বয়সভেদে সাধারণত ৩৫০–৩৬০ মি.গ্রা.

এটি খাবারসহ দৈনিক মোট চাহিদা; শুধু সাপ্লিমেন্টের পরিমাণ নয়। বয়স, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য বিষয় অনুযায়ী প্রয়োজন পরিবর্তিত হতে পারে।

ম্যাগনেসিয়ামের অভাব বুঝবেন কীভাবে?

শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে ম্যাগনেসিয়ামের মাত্রা, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও কিডনির কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করতে পারেন।

রক্তে ম্যাগনেসিয়ামের ফল স্বাভাবিক থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে শরীরের মোট ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না। তাই পরীক্ষার ফলের পাশাপাশি রোগীর লক্ষণ, খাদ্যাভ্যাস ও ওষুধের ইতিহাস বিবেচনা করা জরুরি।

ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্ট কি নিজে থেকে খাবেন?

না, প্রয়োজন নিশ্চিত না করে বেশি মাত্রায় ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্ট খাওয়া ঠিক নয়। অতিরিক্ত গ্রহণে ডায়রিয়া, পেটব্যথা ও বমি বমি ভাব হতে পারে। কিডনির কার্যক্ষমতা কম থাকলে শরীরে ম্যাগনেসিয়াম বিপজ্জনকভাবে জমে যেতে পারে।

কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ও অন্যান্য ওষুধের শোষণেও ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্ট প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিন।

কখন দ্রুত চিকিৎসা নেবেন?

পেশিতে টান বা দুর্বলতা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। তবে অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দনের সঙ্গে মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি বা গুরুতর বিভ্রান্তি দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

শেষ কথা: সুস্থতার শুরু হোক সুষম খাদ্য থেকে

শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে ম্যাগনেসিয়াম অপরিহার্য। প্রতিদিনের খাবারে ডাল, বাদাম, বীজ, সবুজ শাক ও পূর্ণশস্য রাখার মাধ্যমে এর চাহিদা পূরণে সহায়তা করা যায়।

তবে শরীরের প্রতিটি দুর্বলতা বা পেশির টানের পেছনে ম্যাগনেসিয়ামের অভাব রয়েছে—এমন ধারণা ঠিক নয়। প্রয়োজনে পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সঠিক কারণ শনাক্ত করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

আপনার বা আপনার পরিচিত কারও কি পেশিতে টান, সারাক্ষণ ক্লান্তি কিংবা হাত-পা ঝিনঝিন করার সমস্যা রয়েছে? আপনার অভিজ্ঞতা মন্তব্যে জানাতে পারেন। সচেতনতামূলক এই লেখাটি পরিবার ও পরিচিতজনদের সঙ্গে শেয়ার করুন।

লেখা: রেজিস্টার্ড অল্টারনেটিভ মেডিসিন প্র্যাকটিশনার  মোহাম্মদ মোরশেদ আলম মাসুদ

তৃণমূল ২৪ | ডাক্তারের কলাম

স্বাস্থ্য-তথ্যসংক্রান্ত নোট: এই লেখা সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি। এটি ব্যক্তিগত রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়।

তথ্যসূত্র:
১. National Institutes of Health (NIH), Office of Dietary Supplements — Magnesium: Fact Sheet for Health Professionals।
২. NIH — Magnesium: Fact Sheet for Consumers।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button